
হাওরের ধান সুনামগঞ্জের কৃষকের মেরুদণ্ড!
– মো: জিল্লুর রহমান চৌধুরী

আমি হাওর পারের মানুষ।প্রায় পঞ্চাশ বছরের অধিক সময় ধরে হাওর জীবনের সঙ্গে পরিচয়।এখানে আমরা অনেক কষ্টে বেঁচে থাকি,বড় হই।যে দু:খ সেই কয়েক দশক আগে দেখেছি তা যখন এখনো বারবার ফিরে আসে তখন খুব হতাশ হয়ে পড়ি।চাকরির কারণে বহু বছর গ্রাম থেকে দূরে থাকা।তবে,ওএসডি হওয়ায় প্রায় বছরদুয়েক হলো বেশির ভাগ সময় মায়ের কাছে গ্রামেই থাকছি।সে সুবাদে পুরনো গ্রামীণ জীবন,কৃষি আর কৃষকের চালচিত্র সব আবারও বছর ঘুরে দেখতে পাচ্ছি।এ বছর আবার সেই করুণ দৃশ্য ফিরে এসেছে।
সুনামগঞ্জের মানুষের অবলম্বন মূলত হাওরের এক ফসলী বোরো ধান এবং সেই হাওরের মাছ।তবে,ধানই বড় অবলম্বন। খনিজ বালু,পাথর যা আছে তার পুরোটাই জাতির প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়।শিল্প বলতে এ জেলায় তেমন কিছু নেই।তাই,এই এক ফসলী বৈশাখী ধানই সুনামগঞ্জের প্রায় শতভাগ কৃষকের সারা বছর খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সম্বল।
পৌষে ধান রোপণ শুরু হয় আর বৈশাখে কাটা হয়।বৈশাখ মাসে আবার কাল বৈশাখীও শুরু হয়।বঙ্গোপসাগরের পানি জলীয় বাষ্প হয়ে সুনামগঞ্জের উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ঝড়,তুফান,বৃষ্টি ,শিলা বৃষ্টি বা অতি বৃষ্টি ইত্যাদিতে রূপ নেয়।যে বছর কাল বৈশাখী কম হয় সে বছর কৃষকের মুখে হাসি।আর যে বছর তা রুদ্ররূপ ধারণ করে অতিবৃষ্টি আর অকাল বন্যা ঘটায় সে বছর সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়,বৃষ্টিপাতের সঙ্গে হাওরের কৃষকের চোখেও অশ্রুপাত হয়।এবার আবার কালবৈশাখী রুদ্ররূপ ধারণ করেছে;এখন চারিদিকে কৃষকের সেই হাহাকার আর কান্নার ধ্বনি শোনা যাচ্ছে!
সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল বহুকারণে নষ্ট হয়।কখনো অতি বৃষ্টিতে (ডুবরা),কখনো অকাল বন্যায়,কখনো খরায় আবার কখনোবা শিলাবৃষ্টিতে।এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা অতিবৃষ্টি এবং অকাল বন্যা। এ সমস্যা থেকে হাওর বাঁচাতে বেরি বাঁধ দেওয়া হয়।কয়েক বছর ধরে পিআইসি নামক এই সরকারি কাজ হাওর পারের মানুষের এক অতি পরিচিত বিষয়।কয়েক শত কোটি টাকা এ খাতে ফিবছর বরাদ্দ আসে।কাজ হয়,কাজ হয় না,অনিয়ম হয়,দুর্নীতি হয়-এ নিয়ে নানা পক্ষের নানা কথা।মাঝে মাঝে দুর্নীতির তদন্তও হয়,প্রতিবাদ,মিছিল,মিটিং ইত্যাদি লেগেই থাকে।
কিন্তু আসল কথা হলো,যে বছর প্রকৃতি সদয় হয়,সে বছর এই পিআইসি কাজের মানের প্রসঙ্গ তেমন সামনেই আসেনা।কারণ কৃষক ফসল কেটে হাসিমুখে গোলায় উঠায়।সবাই খুশি।বাঁধের কাজ যারা করলেন বা করলেন না তারাও হাফ ছেড়ে বেঁচে যান! ভেতরে ভেতরে কি হলো না হলো কেউ তা দেখতেও যায় না।কারণ প্রকৃতি সেই বার সবাইকে বাঁচিয়ে দেয়!
এই কয়েক দশকে অনেক কিছুই বদলে গেছে।জলবায়ু,আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়েছে,দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে।বাঁধ,পাকা রাস্তা,ব্রিজ,কালভার্ট,বাড়িঘর,স্থাপনা নির্মাণ ইত্যাদি সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে।প্রকৃতির বানানো সেই শাখা প্রশাখা নদী বা খালগুলো আর আগের মতো নেই।নদীগুলোর নাব্যতাও অনেক কমে গেছে।
তাই,বঙ্গোপসাগরের যে পানি মেঘালয় হয়ে আমাদের সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি আর অকাল বন্যা ঘটায় সে পানি সুরমায় পড়ে কুশিয়ারা আর মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে দ্রুত ফিরে যায় না! এই বিশাল জলস্রোত চারপাশে উপচেপড়ে,পিআইসি নামক মাটি বা মাটিবালির বাঁধ দিয়ে একে ঠেকানো একেবারেই সম্ভব নয়! সে জন্য প্রয়োজন একটি সময়োপযোগী মহাপরিকল্পনা।
এই মহাপরিকল্পনায় বিশ্বমানের বাঁধ নির্মাণ এবং নদী শাসনের সুযোগ থাকবে,থাকবে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জে অসাধারণ পর্যটন সুবিধা! আমরা জানি, বিশ্বে নেদারল্যান্ডসসহ অনেক দেশ এই প্রযুক্তিতে বিখ্যাত।ব্যয়বহুল হলেও আমাদের সুনামগঞ্জের হাওর বিপর্যয়ের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য এই টেকসই প্রযুক্তি প্রয়োগ অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ সময়ে জাতীয় উন্নয়নে সুনামগঞ্জের সম্পদ ব্যবহৃত হয়েছে।স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অনেক উন্নয়ন হয়েছে; অনেক জেলার অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে।কিন্তু এটি বাস্তব সত্য যে,উন্নয়ন পদযাত্রায় সুনামগঞ্জ অনেক পিছিয়ে আছে।তাই,পশ্চাৎপদ সুনামগঞ্জের জন্য সুষম উন্নয়নের আদর্শ অনুযায়ী জাতীয় বাজেটে বছর বছর বরাদ্দ রেখে পর্যায়ক্রমে বিশ্বমানের প্রকল্প বাস্তবায়ন করার দাবী কখনো আমাদের সুনামগঞ্জের মানুষের অলীক কল্পনা নয়।এটি আমাদের জীবন মরণ সমস্যা এবং এর সমাধানে আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নও সম্ভব।
পরিশেষে বলব,সম্পূর্ণ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্পদ স্বল্পতার কারণে প্রয়োজনে আগামী পঞ্চাশ বা একশ বছরও যদি আমাদের অপেক্ষা করতে হয় আমরা করব; তবুও এখনই তা শুরু করা হোক -এ আমাদের প্রাণের দাবী। কারণ,এটি বাস্তবায়িত হলে একদিন সুনামগঞ্জের হাওর পারের মানুষের এই অনিশ্চয়তা,উৎকণ্ঠা আর অশ্রুপাতের অবসান হবে।অন্যতায়,এই জনপদের মানুষ কখনো মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না;যেমনটি বিগত শত শত বছরেও তাঁরা পেরে উঠেনি!কৃষকদের জীবন – জীবিকা নিয়ে অবহেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই। হাওরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে দায়িত্বশীলদের আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে ।
লেখক : গ্রেড-১(ওএসডি),জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।