টোল আদায় বন্ধে কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কায় ইজারাদার
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) লালপুর ও গজারিয়া ঘাটের ইজারা নিয়ে টোল আদায়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। পাথরবাহী নৌযান থেকে টন হিসাবে টোল আদায় করা হবে, নাকি ঘনফুট হিসাবে—এ নিয়ে ইজারাদার, ব্যবসায়ী ও নৌযানসংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরোধ চলছে। এতে ঘাট দুটিতে টোল আদায় বন্ধ রয়েছে। ইজারাদারদের অভিযোগ, বাড়তি সুবিধা না দেওয়ায় একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে বিরোধ সৃষ্টি করছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঘাট দুটি ইজারা নিয়েছেন জিয়াউর রহমান ও ওয়াহেদ আলী। ইজারাদারদের দেওয়া দরপত্র ও চুক্তিসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, পাথরের ক্ষেত্রে প্রতি মেট্রিক টনে ৭০ টাকা এবং বালুর ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৫০ পয়সা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। ইজারাদারদের দাবি, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাথরের টোল টন হিসাবে আদায় করে আসছেন তাঁরা। অন্যদিকে, নৌযানসংশ্লিষ্টদের একাংশ ঘনফুট হিসাবে টোল দিতে চাইছেন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারত থেকে আমদানি করা এলসি পাথর ও চুনাপাথর মেট্রিক টনে কেনাবেচা হয়। গত ১৬ অক্টোবর বাগলি-বটছড়া এলাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়। কয়েকটি চালানে পাথরের পরিমাণ ঘনফুট হিসাবে উল্লেখ থাকলেও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, পণ্য কেনাবেচার চালান তাঁরা টন হিসাবেই দিয়ে থাকেন।এলসি পাথর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স কে কে এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মাসুদ আলম বলেন, ভারত থেকে মেট্রিক টন হিসাবে বড় পাথর কিনে আনা হয়। পরে তা ভেঙে ছোট করে দেশীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। তবে চালান দেওয়া হয় টন হিসাবেই।
মেসার্স আনিসুল হক এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক জানান, এলসি পাথর, চুনাপাথর ও কয়লা মেট্রিক টনে কেনাবেচা করা হয়। দেশীয় ব্যবসায়ীরা ঘনফুটে চালান লেখার কথা বললেও তাঁরা চালানে তা উল্লেখ করেন না। তবে টোকেনে রূপান্তর করে ঘনফুটের হিসাব দেওয়া হয়।
রিহাদ নিহা এন্টারপ্রাইজের চুকানি ইনু মিয়া বলেন, ২৫ বছর ধরে নৌযানে পাথর পরিবহন করে আসছি। বাগলি একার ব্যবসায়ীদের চালানে টনের হিসাব থাকে এবং তিনি সরজমিনে চালান দেখিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এলসি ও চুনাপাথর কেনাবেচা হয় টনে।
বণিক এন্টারপ্রাইজের চুকানি বনমালি দাস বলেন, পাথর কেনার সময় মেট্রিক টনে হিসাব করা হয়। আমার কাছে অনেক চালান আছে, তবে তবে সরজমিনে চালানগুলো দেখালে তা মেট্রিক টনেই ছিল। তবে একটি টোকেনে ঘনফুটের হিসাব পাওয়া যায়, এবিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,আমাদের পরিবহন বাড়া মুলত ঘন ফুটে হয় তাই টন কে ঘন ফুটে কনভার্ট করি।
টোলের হিসাবে বড় পার্থক্য ইজারাদার ও নৌযানসংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এক টন পাথরকে ২৫ ঘনফুট ধরে প্রতি ঘনফুটে ৫০ পয়সা হিসাবে টোল দাঁড়ায় ১২ টাকা ৫০ পয়সা। অন্যদিকে, টনপ্রতি নির্ধারিত ৭০ টাকা হিসাবে একই পরিমাণ পাথরের জন্য দিতে হয় ৭০ টাকা। দুই পদ্ধতিতে টনপ্রতি পার্থক্য ৫৭ টাকা ৫০ পয়সা। এ ব্যবধানকে কেন্দ্র করেই বিরোধ আরও জটিল হয়েছে।
পাশবর্তী উপজেলা তাহিরপুরের বাগলি এলাকায় পাটলাই নদীর ঘাটে গিয়েও অনুসন্ধান করা হয়। সেখানে ইজারা আদায়কারীরা জানান, তাঁরা মেট্রিক টন হিসাবে টোল আদায় করছেন। তাঁদের ভাষ্য, প্রতি টনে ৭০ টাকা হারে টোল আদায়ের নির্দেশনা রয়েছে।
বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিআইডব্লিউটিএর একজন উপপরিচালকসহ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ইজারাদারদের দাবি, কমিটি তাঁদের নথিপত্র পর্যালোচনা করলেও লিখিত সিদ্ধান্ত দেয়নি। এর মধ্যেই সংশ্লিষ্ট উপপরিচালক ব্যবসায়ী ও নৌযানসংশ্লিষ্টদের ঘনফুট হিসাবে টোল দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁদের। এতে বিরোধ আরও বেড়ে যায় এবং টোল আদায় বন্ধ হয়ে পড়ে।
ইজারাদার জিয়াউর রহমান বলেন, দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী টোল আদায় করছেন তাঁরা। এর আগেও কয়েকবার গজারিয়া ঘাটের ইজারা নিয়েছেন এবং টন হিসাবেই টোল আদায় করেছেন। এবার কিছু রাজনৈতিক নেতাকে বাড়তি সুবিধা না দেওয়ায় তাঁরা ঘাটে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রায় দুই মাস ধরে ঘাটে টোল আদায় বন্ধ রয়েছে। টোল আদায় করতে গেলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর আদায়কারীদের মারধরও করা হয়েছে।
অন্য ইজারাদার ওয়াহেদ আলী বলেন, দরপত্র ও চুক্তিপত্রে এলসি পাথর, চুনাপাথর ও কয়লার টোল টন হিসাবে আদায়ের নির্দেশনা রয়েছে। সেই অনুযায়ী মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ইজারা নিয়েছেন তিনি। এখন পাথরের টোল ঘনফুটের হিসাবে দিতে চাওয়ায় বিরোধ তৈরি হয়েছে। বালুর ক্ষেত্রে তাঁরা ঘনফুট হিসাবে টোল আদায় করেন বলেও জানান তিনি।
ইজারাদারদের দাবি, অর্থবছরের শুরুতে প্রায় এক মাস টন হিসাবে টোল আদায় করা হয়েছিল। পরে ঘনফুটে টোল দেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র হয়। টোল আদায় বন্ধ থাকায় তাঁদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।তদন্ত রিপোর্ট তৈরি একটা সময়সাপেক্ষ বিষয় তাই সবাইকে ধৈর্যধারণ করতে বলেন।