
রাজবাড়ীর পদ্মা পাড় থেকে ঢাকার পরিত্যক্ত দলীয় কার্যালয়—এক সময়ের প্রতাপশালী আওয়ামী লীগের বর্তমান অস্তিত্ব এখন কেবলই অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী আইনি ও রাজনৈতিক ধাক্কায় দলটির ভবিষ্যৎ এখন এক বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
ভোরবেলা পদ্মা নদীতে জাল গুটিয়ে পা ধুতে ধুতে রাজবাড়ীর রিপন মৃধা খুঁজছিলেন পরিচিত সেই সব ব্যানার-পোস্টার। কিন্তু দেয়ালে এখন আর কোনো নেতার হাসিমুখ নেই। ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের চিহ্ন মুছে গেছে রাজপথ থেকে। রিপন মৃধার মতো আজীবন নৌকায় ভোট দেওয়া সমর্থকেরা এখন আতঙ্কে আর দ্বিধায়:
ঢাকার গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন গৃহহীনদের আশ্রয়স্থল। ভবনের যে কক্ষে একসময় নীতি-নির্ধারণী বৈঠক হতো, সেখানে এখন আগুনের দাগ আর পরিত্যক্ত আসবাব। হকারদের মতে, আওয়ামী লীগের নাম নেওয়ার মতো মানুষও এখন এলাকায় বিরল। অথচ পাশেই বিক্রি হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতীক সংবলিত শীতের কাপড়—যা বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাতাসেরই ইঙ্গিত দেয়।
|
বিশ্লেষক |
মূল পর্যবেক্ষণ |
|---|---|
|
রেজাউল করিম রনি |
ভোটাররা স্থানীয়ভাবে অন্য শক্তির সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজেদের জীবন সাজাতে শুরু করবে। একবার নির্বাচন হয়ে গেলে সমর্থকদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। |
|
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ |
আওয়ামী লীগ শুধু নেতৃত্ব নয়, এটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শক্তির সাথেও যুক্ত। তাই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। জামায়াতের উত্থান আওয়ামী লীগের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। |
|
মাইকেল কুগেলম্যান |
দক্ষিণ এশীয় বংশানুক্রমিক দলগুলো সহজে মরে যায় না। বর্তমান সংকট কাটলে এবং কোনো রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হলে দলটি ফিরেও আসতে পারে। |
ফেব্রুয়ারি ১২-এর নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিচ্ছেন:
শেখ হাসিনা এখন প্রতিবেশী দেশ ভারতে নির্বাসিত। তার অনুপস্থিতিতেই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। অথচ এই ট্রাইব্যুনাল তিনিই গঠন করেছিলেন বিরোধীদের বিচারের জন্য—ইতিহাসের এই পরিহাস এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ভারত থেকে অডিও বার্তার মাধ্যমে কর্মীদের চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করলেও, দেশের মাটিতে দলটির কোনো দৃশ্যমান সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই।
"আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে, আর যখন ফিরবে শেখ হাসিনাকে নিয়েই ফিরবে।"
— আরমান, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা
১৯৭৫-এর ট্র্যাজেডির পর আওয়ামী লীগ যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট তার চেয়েও জটিল বলে মনে করছেন তৃণমূলের সমর্থকরা। রাজবাড়ীর সেই মাঝি রিপন মৃধার ভাষায়, এবারের পরিস্থিতি "রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো।" ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনই হয়তো বলে দেবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের স্থান কোথায় গিয়ে ঠেকবে।